হেপাটাইটিস রোগের লক্ষণ,কারন,চিকিৎসা

হেপাটাইটিস বলতে লিভার কোষের প্রদাহকে বোঝায় । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বলতে ভাইরাসজনিত লিভারের প্রদাহকে বোঝায় ‌। বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভাইরাসজনিত সংক্রমণ । অন্যান্য কারনের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন , নির্দিষ্ট কিছু শ্রেনীর ওষুধ , বিষাক্ত উপাদান , অন্যান্য সংক্রমণ , অটোইমিউন ডিজিজ ইত্যাদি । হেপাটাইটিস মূলতঃ অস্থায়ী বা একিউট এবং দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক হতে পারে । সময়ের সাথে সাথে ক্রনিক হেপাটাইটিসের হতে লিভার স্কারসহ লিভার ফেইলর বা লিভার ক্যান্সার হতে পারে ।

অন্যান্য কারনসমূহ :

১। সাইটোমেগালোভাইরাস ।
২। এপিসটেইন – বার – ভাইরাস ।
৩। হারপেস সিমপ্লেক্স ।
৪। ইয়োলো ফিভার ।
৫। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন ।
৬। নির্দিষ্ট ওষুধ ।
৭। বিষাক্ত উপাদান ।
৮। অটোইমিউন ডিজিজ ‌।

হেপাটাইটিসের লক্ষনসমূহ :

১। জন্ডিস ।
২। লিভারের অতি বৃদ্ধির প্রবণতা ।
৩। মাঝে মধ্যে প্লীহার মৃদু বৃদ্ধি এবং সার্ভিক্যাল লিম্ফ্যাডিনোপ্যাথি দেখা যায় ।
৪। ক্ষুধামান্দ্য ও ক্লান্তি ।
৫। বমি ।
৬। পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া ।

পরামর্শ :

১। রোগীকে বিশ্রামে রাখতে হবে । চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন বিশ্রামের মাত্রা । কারন এসব রোগীর এমনিতেই ক্ষুধা , বমি , বমিভাব , ক্লান্তিকর অবস্থা থাকে ।
২। অনেক সময় এ সকল রোগীদের হলুদ দিয়ে খাবার দিতে চান না । অথচ এ সময় রোগীর রুচি অনুযায়ী হলুদ , মরিচ , লবণ সহযোগে স্বাভাবিক রান্না করা খাবার খেতে দেওয়া উচিত । মনে রাখতে হবে রোগী যত খেতে পারবে তত দ্রুত তার লিভারের উন্নতি হবে ।
৩। যত্রতত্র পানি পান করা যাবে না । অবশ্যই ফুটানো বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে । এক্ষেত্রে খাবার পানি টগবগ করে ফুটে ওঠার পর অন্ততঃ ৩০ মিনিট ধরে ভালোভাবে ফুটাতে হবে । এর ফলে সকল প্রকার ভাইরাস ধ্বংস হয় । তবে ক্লোরিনেশন বা পানি বিশুদ্ধকরণ বড়িতে উক্ত ভাইরাস ধ্বংস হয় না । গ্রামগঞ্জে টিউবওয়েলের পানি খাবেন ।
৪। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে স্যানিটারি ল্যাটিন থাকা জরুরী । যেখানে – সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করা যাবে না । মলমূত্র ত্যাগের পর হাত সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে ।
৫।অসুস্থ হলে ইনজেকশন দেয়ার সময় ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করুন। তা সম্ভব না হলে নিডল ও কাঁচের সিরিঞ্জটি ৩০ মিনিট ফুটন্ত পানিতে ফুটিয়ে তবেই ব্যবহার করবেন ।
৬। শরীরে রক্ত সঞ্চালনের পূর্বে রক্তের ভাইরাসের পরীক্ষাগুলো করে নেবেন।
৭। আক্রান্ত রোগীর সাথে ওঠা – বসা , মেলা – মেশা , খাওয়া – দাওয়া , ঘনিষ্ঠ বা ব্যক্তিগত সাহচর্যে আসা নিরাপদ নয় ।
৯। ‘সি’ ভাইরাসের টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি , তবে ‘বি’ ভাইরাসের টিকা দেশে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে । টিকা নেওয়ার আগে আপনার রক্ত পরীক্ষা করতে হবে । যদি HBsAg নেগেটিভ হয় , জন্ডিস বা লিভারের অন্য কোনো অসুখ না থাকে , তবে আপনি টিকা নিতে পারবেন ।
৯। যারা হেপাটাইটিস বয়ে বেড়াচ্ছেন , তাদের মদ ও অ্যালকোহল পান নিষিদ্ধ । যারা অতিরিক্ত মদ্যপায়ী নন, তাদেরও সিরোসিস হতে পারে ।
১০। স্বাভাবিক হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগীরা পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন । যদি সিরোসিস হয়ে যায় লবণ কম খেতে হবে ।

ভাইরাল হেপাটাইটিসের কারনসমূহ :

১। সাধারণ কারণ –
হেপাটাইটিস এ – হেপাটাইটিস এ দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণজনিত হেপাটাইটিস বা প্রদাহ পৃথিবীর প্রায় সবস্থানেই মহামারী আকারে দেখা দেয় । এটি মূলতঃ শিশুদেরকে বেশি প্রভাবিত করে কারণ তাদের প্রায় সময় লক্ষনহীন মৃদু অসুস্থতা থাকে । এ সংক্রমণ মূলতঃ হাত , খাদ্য , পানি দ্বারা পায়ুপথ ও মুখের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে । দেহে প্রবেশের পর ১৫-৫০ দিনের সুপ্তকাল থেকে প্রথম রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায় । ক্লিনিক্যাল কোনো লক্ষণ প্রকাশের ৭-১৪ দিন পূর্বে বা ৭ দিন পর মলের মাধ্যমে উক্ত ভাইরাস বাইরে নিঃসৃত হয় ‌। জন্ডিসের ক্ষেত্রে সাধারণত অসুস্থতাবোধ , অস্থিরতা , প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া এবং মলের রং বিবর্ণ বা ফ্যাকাশে হয় । রোগমুক্তির পর উক্ত ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় , ফলে পরবর্তীতে উক্ত ভাইরাসের বিরুদ্ধে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে , অনেক সময় উপসর্গ সংক্রান্ত রোগ ঘটতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে উক্ত ভাইরাস বহন করে না ।

হেপাটাইটিস বি – হেপাটাইটিস বি যা সেরাম হেপাটাইটিস নামেও পরিচিত । এটি যেকোনো বয়েসেই হতে পারে , তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বয়স্কদের দেখা যায় । এ ভাইরাসের সুপ্তাবস্থার সময়কাল ৫০-১৮০ দিন । এ ভাইরাস রক্তে প্রবেশ করে বিস্তার লাভ করে এবং রক্ত ও রক্তের উপাদানসমূহকে দূষিত বা রোগগ্রস্থ করে তোলে । যে সকল মানুষ রক্ত নিয়ে বা রক্তের উপাদান নিয়ে কাজ করে তাদের মধ্যে উক্ত সংক্রমণের ঝুঁকি সর্বাধিক থাকে। যেমন- স্বাস্থ্যকর্মী ; এছাড়াও উক্ত ভাইরাস দেহের বিভিন্ন তরল পদার্থ যেমন – লালারস , শুক্রাণু , যোনীপথের নিঃসরণ , মা থেকে ভ্রণে বিস্তার লাভ করে । অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরার ভেতর ওষুধ প্রয়োগ , পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি । সাধারণত সংক্রমণের ২-৬ সপ্তাহের মধ্যে অসুস্থতা তীব্র হয় এবং প্রায় ক্ষেত্রেই রোগ মুক্তির পর স্থাস্থের সুরক্ষা ও ক্রমন্নতি ঘটে । ক্লিনিক্যাল উপসর্গ দ্বারা দেখা গেছে এক্ষেত্রে রোগী উক্ত ভাইরাস বহন করে বা বহন করে না । অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস গুরুতরভাবে লিভার নেক্রোসিস বা পচন ঘটায় ফলে মৃত্যু ঘটে । কম গুরুতর ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে যায় । অন্যদিকে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে প্রদাহ বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে জীবন্ত ভাইরাস রক্তসহ দেহের অন্যান্য তরল পদার্থের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয় । এ অবস্থা থেকে রোগের প্রবণতা বেড়ে গিয়ে লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারে রূপ নেয় ।

হেপাটাইটিস সি :

এ ভাইরাস রক্ত এবং রক্তের উপাদান দ্বারা বিস্তার লাভ করে । রক্ত ট্রান্সফিউশনের মাধ্যমেই প্রধানতঃ সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে , ইনজেকশন দ্বারা মাদক – ড্রাগ গ্রহণে একই সুচ ব্যবহারেও এ ভাইরাস বিস্তার লাভ করতে পারে । ভাইরাস দূষিত রক্ত বা প্লাজমা ডেরিভেটিভের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শেও এ রোগ বিস্তার লাভ করে । হেমোফেলিয়ায় ( রক্তক্ষরণ ) আক্রান্ত রোগীসহ অনেক মানুষের মধ্যে এ সংক্রমণ ঘটে। সংক্রমণ উপসর্গহীন এবং প্রায়ই ঘন ঘন ঘটে । এ জীবাণু বহনকারীরও এ অবস্থা ঘটে । সংক্রমণ যদি দেরীতে ধরা পড়ে তখন দেখা যায় লিভার সিরোসিস বা দীর্ঘমেয়াদি লিভার ফেইলর বা অকার্যকারিতা দেখা দেয় । হেপাটাইটিস সি কে নীরব ধাতব বলা হয় কারণ সহজেই এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না ফলে রোগী বুঝতেই পারে না যে তার রোগ হয়েছে । রোগ অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর অর্থাৎ লিভার সিরোসিস হবার পরই পারে তার হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ হয়েছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে , প্রায় ১৭ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস সি সংক্রমণে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ৩০ – ৪০ লক্ষ মানুষ এ রোগের শিকার হচ্ছে । এক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে শতকরা ৩ ভাগ মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বাহক অর্থাৎ রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ৪০ লক্ষ । তবে এ সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

হেপাটাইটিস ডি – এ ভাইরাসে কোনো আর, এন, এ থাকে না এবং এটি শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের উপস্থিতিতে বংশ বিস্তার করে । প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহনকারীরা ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় ওষুধ গ্রহণের দ্বারা সংক্রমিত হয় । কিন্তু হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগী ছাড়াও অন্যরাও সংক্রমিত হয় ‌।

হেপাটাইটিস ই – বাংলাদেশে জন্ডিসের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ই ভাইরাস । এ ভাইরাসের কারণে লিভারে স্বল্পমেয়াদি প্রদাহ হতে পারে । তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হয় না ‌। হেপাটাইটিস ই দ্বারা যে কোনো বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারে ‌। তবে ১৫-৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয় । শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই এ রোগ দেখা দিতে পারে । বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় এ ভাইরাস বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে । হেপাটাইটিস ই মূলতঃ পানিবাহিত একটি ভাইরাস । উক্ত ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৩০ – ৫০ দিন । দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে। ফুটপাতের খাবার , শরবত বা ফলের রস খেলে এ ভাইরাস শরীরে ঢোকে । তারপর লিভারে গিয়ে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং জন্ডিস হয় । হেপাটাইটিস ই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যেতে পারে । তবে কিছু ক্ষেত্রে মহামারী আকারও ধারণ করে । এটি অনেক সময় লিভারকে ধ্বংস করে দিতে পারে ‌, তবে সাধারণত এ ধরনের জটিলতা খুব বেশি হয় না । তারপরও
এ বিষয়ে সকলের সাবধান হতে হবে ।

চিকিৎসা :

Cap. Livec 1+1+1
Syp.Icturn 4+0+4
Suy.Cinkara 4+0+4
J.Jalinoos 1+0+1

Hakim Md. Abdur Rashid
D.U.M.S Dhaka
Hamdard Laboratories (Waqf) Bangladesh
Mobile: 01866508440

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *